কংক্রিটের উপাদানসমূহের কাজ

0
301

কংক্রিটের উপাদানসমূহের কাজ (Functions of the ingredients of concrete)

কংক্রিটের উপাদানসমূহ নিম্নরূপঃ

১। সিমেন্ট (বাইন্ডিং ম্যাটেরিয়াল হিসাবে)।

২। সরু দানা (Fine aggregate)।

৩। মােটা দানা (Coarse aggregate)।

৪। পানি (Water)।

৫। অ্যাডমিক্সার (Admixtures)।

সিমেন্ট (Cement)-

প্রকৌশল কাজে সিমেন্ট জমাট বাঁধাইকারী উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কংক্রিটের বিভিন্ন উপাদানসমূহকে একত্রে ধরে রাখাই হল সিমেন্টের কাজ। চুনা পাথরের সাথে সঠিক অনুপাতে মাটি মিশিয়ে গুড়া করা হয় এবং মিশ্রণকে চুল্লীতে (Kiln) এ উত্তপ্ত করলে ক্লিঙ্কারে পরিণত হয়। এ ক্লিঙ্কার (Clinker) মিহি করে গুঁড়া করলে কৃত্রিম সিমেন্ট পাওয়া যায়। কোথায় কোন ধরনের সিমেন্ট ব্যবহৃত হবে, তা নির্ভর করে কাজের অবস্থা এবং কাঠামাের ধরনের উপর। বিভিন্ন রকম কৃত্রিম সিমেন্টের মধ্যে পাের্টল্যান্ড সিমেন্ট বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সাধারণত কংক্রিটের কাজে পাের্টল্যান্ড সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়। সিমেন্টকে প্রধানত পাঁচটি গ্রুপে ভাগ করা যায়, যথাঃ

১। সাধারণ পাের্টল্যান্ড সিমেন্ট (Ordinary Portland Cement)

২। হাই অ্যালুমিনা সিমেন্ট (High Alumina Cement)

৩। সুপার সালফেট সিমেন্ট (Super Sulphate Cement)

৪। প্রাকৃতিক সিমেন্ট (Natural Cement)

৫। বিশেষ সিমেন্ট (Special Cement)

উপরােক্ত পাঁচ প্রকার মান সম্পন্ন পাের্টল্যান্ড সিমেন্টের মধ্যে American Society of Testing Materials (A. S .T. M) দুই ধরনের বিনির্দেশিকা (Specification) নির্দিষ্ট করেছেন। যথাঃ

  •  A. S. T. M. type-1 যা সাধারণ কাজে ব্যবহৃত হয় এবং ২৮ দিনে প্রয়ােজনীয় শক্তি অর্জন করে।
  • A. S. T. M. type-2 দ্রুত কঠিনীক্ষম সিমেন্ট যা ৭ দিনে বা তারও কম সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট শক্তি অর্জন করতে সক্ষম।

এগ্রিগেটস (Aggregates)-

সিমেন্ট কংক্রিটের যে সকল পদার্থ পূরক (Filler) হিসাবে ব্যবহার করা হয় তা এগ্রিগেট নামে পরিচিত। বালি, গ্রাভেল, পাথরের টুকরা ইত্যাদি এগ্রিগেট হিসাবে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে ইটের টুকরা এগ্রিগেট হিসাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সিমেন্ট কংক্রিটের মধ্যে, কংক্রিটের মােট আয়তনের প্রায় ৭৫% ভাগ এগ্রিগেট থাকে। আকৃতির (Size) উপর নির্ভর করে এগ্রিগেটকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, যথাঃ

১।মােটা দানা (Coarse aggregate)

২। সরু দানা (Fine aggregate)

মােটা দানা (Coarse aggregate)-

এগ্রিগেটের কণাগুলাে যদি ৪.৭৫ মিমি (১৬”) চালুনির ছিদ্র দিয়ে অতিক্রম না করে, সেগুলােকে মােটা দানা (Coarse aggregate) বলে। অর্থাৎ এগ্রিগেটের যে সকল কণা ৭৫ মিমি চালুনির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। কিন্তু ৪.৭৫ মিমি চালুনিতে বাধাপ্রাপ্ত হয়, সে সকল কণাগুলােকে মােটা দানা বলা হয়। কাজের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে কোর্স এগ্রিগেটের আকার নির্ধারণ করা হয়। বৃহৎ কাজে (যেমন- ড্যাম) সর্বোচ্চ ২০ সেমি আকারের এগ্রিগেট ব্যবহার করা যেতে পারে। সাধারণ কংক্রিট-এর কাজে ৬৩ মিমি এবং আর. সি. সি. কাজে সর্বোচ্চ ২৫ মিমি। আকারের এগ্রিগেট ব্যবহার করা যেতে পারে।

শক্ত পাথরের টুকরা এবং গ্রাভেল সাধারণত এগ্রিগেট হিসাবে ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশে ইটের টুকরা কোর্স এগ্রিগেট হিসাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এক নং পিকেড (Picked) ইটের খোয়া অগ্নিরােধক হিসাবে পাথরের টুকরা অপেক্ষা উত্তম। তবে ইটের খোয়া ২৪ ঘণ্টা যাবৎ পানিতে ভিজিয়ে রাখলে যদি ১০% ভাগের বেশি ওজনে বৃদ্ধি পায়, তবে . সেরূপ খােয়া ব্যবহার না করাই ভাল।

সরু দানা (Fine aggregate)-

যে সব এগ্রিগেট ৪.৭৫ মিমি চালুনি দিয়ে অতিক্রম করবে তা সরু দানা বা ফাইন এগ্রিগেট হিসাবে পরিচিত। প্রাকৃতিক উপায়ে যে বালি পাওয়া যায়, তা ফাইন এগ্রিগেট হিসাবে কংক্রিটে ব্যবহার করা হয় । নদীতে, পাহাড়ে এবং হ্রদের তলদেশে বা গর্তে স্বাভাবিকভাবে বালি জমা থাকে। কংক্রিটে ব্যবহারের পূর্বে বালি ধৌত এবং পরীক্ষা করে ব্যবহার করা হয়। যাতে বালিতে কোন কাদা, সিল্ট, লবণ এবং অন্যান্য জৈব পদার্থ মিশ্রিত না থাকে। সাধারণত প্রাকৃতিক বালি, পাথরের গুঁড়া বা ঐ জাতীয় তীক্ষ কণাযুক্ত শক্ত, টেকসই পদার্থ ফাইন এগ্রিগেট হিসাবে ব্যবহৃত হয়। আর. সি. সি. কাজে চিকন বালি অপেক্ষা মােটা বালি ব্যবহার করা উচিত।

কারণ একই আয়তন বিশিষ্ট চিকন বালির এ পৃষ্ঠদেশের ক্ষেত্রফল মােটা বালির পৃষ্ঠদেশের ক্ষেত্রফল অপেক্ষা বেশি। তাই নির্দিষ্ট পরিমাণ সিমেন্টে অপেক্ষাকৃত বেশি ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট চিকন বালির পৃষ্ঠদেশকে বেষ্টন করে ঝিল্লী সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়। ফলে কংক্রিট দুর্বল হয়ে পড়ে। ভাল কংক্রিটের জন্য ২/৩ অংশ সাধারণ মােটা বালি (এফ. এম.- ১.৫) ও ১/৩ অংশ সিলেট বালি (এফ. এম.-২.৬) ব্যবহার করা হয়। এগ্রিগেট তীক্ষ্ণ কোণাযুক্ত, শক্ত, টেকসই, পরিষ্কার আগাছা ও আবর্জনা মুক্ত হওয়া উচিত। এগ্রিগেট সাধারণত কংক্রিটের আয়তন বৃদ্ধি করে, কোন রূপ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে না।

পানি (Water)-

সিমেন্ট পানির সংস্পর্শে আসলে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে জমাট বাঁধে। পানি, বালি, সিমেন্ট ও মােটা দানার সঙ্গে মিশ্রণে পিচ্ছিলতা প্রদান করে। রাসায়নিকভাবে পানি, সিমেন্ট, বালি ও খোয়ার সঙ্গে আবদ্ধকারী পেস্ট তৈরি করে, যা মােটা দানা ও লৌহকে যুক্ত রাখে। তাই এমন পানি ব্যবহার করা উচিত, যা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সাহায্যকারী হয়। কংক্রিটে যে পানি ব্যবহৃত হবে, তা পরিষ্কার ও পরিশ্রুত হওয়া উচিত। সাধারণভাবে পানীয় পানি কংক্রিটে ব্যবহার করা হয়। বেশি দূষিত পানি জমাট বাঁধতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে বা ইস্পাতের রডে মরিচা ধরিয়ে দিতে পারে। আর. সি. সি. কাজে লবণাক্ত পানি, সমুদ্রের পানি ব্যবহার করা একেবারে নিষিদ্ধ। কারণ এ পানি ব্যবহার করলে রডে মরিচা ধরার আশঙ্কা বেশি থাকে। তবে কংক্রিটে সর্বোচ্চ ৩.৫% লবণ সম্বলিত পানি ব্যবহার করা যেতে পারে। পানিতে বিভিন্ন পদার্থের সর্বোচ্চ গ্রহণযােগ্য মাত্রা নিম্নরূপঃ

১। ২০০ মিলি অম্লযুক্ত নমুনা পানিকে প্রশমিত করার জন্য 0.1Normal NaOH-এর পরিমাণ ২ মিলি (2ml) এর বেশি হওয়া উচিত নয়।

২। ২০০ মিলি (200ml) ক্ষারযুক্ত নমুনা পানিকে প্রশমিত করার জন্য ০.১ normal Hel-এর পরিমাণ ১০ মিলি এর বেশি হওয়া উচিত নয়।

৩। জৈব পদার্থ ০.০২%, অজৈব পদার্থ ০.৩০%, সালফেট ০.০৫% এবং ক্ষার ও ক্লোরাইডসমূহ ০.১০% এর বেশি হবে না।

৪। নমুনা পানি দ্বারা উৎপন্ন কংক্রিটের শক্তি কোন ক্রমেই পাতিত পানি (Distilled water) দ্বারা তৈরি কংক্রিটের শক্তির ৯০% এর কম হবে না।

৫। লবণ পানি ব্যবহারে কংক্রিটের শক্তির পরিবর্তন না হলেও এটা কাঠামাের স্ফোটক (Efloresence) সৃষ্টি করে। তাই এটা ব্যবহারের অনুপযােগী।

অ্যাডমিক্সার (Admixture)-

যে সকল পদার্থ কংক্রিটে ব্যবহার করলে কংক্রিটের গুণাগুণ বৃদ্ধি পায় তথা কংক্রিটের শক্তি বৃদ্ধি পায়, তাকে অ্যাডমিক্সার বলে। যেমন- ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় সিমেন্টের বিক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার জন্য সিমেন্টের ওজনের ১.৫% ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড Accelerator হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

অ্যাডমিক্সার নিম্নলিখিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়ঃ

১। পানি নিরােধক গুণাগুণ প্রদান করতে ।

২। কিউরিং ত্বরান্বিত করতে।

৩। কংক্রিটের কার্যোপযােগিতা বৃদ্ধি করতে।

৪। কংক্রিটের স্থায়িত্বতা বৃদ্ধি করতে।

৫। কংক্রিটকে কঠিন বা জমাট বাধাকে দ্রুততর করতে।

নিম্নলিখিত কারণেও অ্যাডমিক্সার ববহার করা হয়, যথাঃ

১। জমাট বাঁধা মন্থর করতে।

২। কাঠিন্য বৃদ্ধি করতে।

৩। পানির সাথে মিশ্রণে সিমেন্টের দানাগুলােকে চারদিকে ছড়িয়ে দিতে।

৪। জমাট বাঁধার সময় সংকোচন হ্রাস করতে।

৫। বর্ণ প্রদান করে (Desired colour) ।

৬। ক্ষতিকারক রাসায়নিক বিক্রিয়াকে বাধা প্রদান করতে।

৭। ক্ষরণ (Bleeding) হ্রাস করতে।

৮। পানি যােজনের তাপ (Heat of hydration) হ্রাস করতে ।

বিভিন্ন প্রকার কংক্রিটের উপাদানসমূহ

 

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

one + fifteen =